বোধের বাগানে প্রাণের চাষ - মুক্তি আনন্দে আমিও হাসবো।। লিখেছেন : Asad Chowdhury

লিখেছেন : Asad Chowdhury 

বোধের বাগানে প্রাণের চাষ - মুক্তি আনন্দে আমিও হাসবো।

কবি ও গবেষক মুসা আল হাফিজকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছি না। দেশের সাহিত্যাঙ্গণে সময়ের আলোচিত আলোকিত এক ব্যাক্তিত্বের নাম মুসা আল হাফিজ। সাহিত্য সাধনার দ্বারা দেশ, জাতি ও মুসলিম মিল্লাতের নিরলস সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে তিনি এখন অভিভাবকত্ব করছেন পথহারা নাবিকের, ইতিহাস ঐতিহ্যের স্বর্ণালী কম্পাসে দেখাচ্ছেন আলোবিচ্ছোরিত জীবন্ত গন্তব্যের দিশা। তাঁর অঙ্গুলী ইশারায় পথহাটা নাবিকের শিরায় জন্মনেয় বিপ্লবী চেতনার স্ফুরণ। মুক্তির আনন্দে হেসে ওঠে বোধের নদীতে ভেসে চলা আদর্শিক জীবনের প্রত্যয়দ্বীপ্ত মুসাফির।

তিনি ডুবন্ত প্রায় ইতিহাসের কান ধরে টান দিলেন ঠিক তখন, যখন মিথ্যা, অন্যায় আর ভুলের স্বৈরদেয়ালে বেষ্টিত কাতর নিজেদের গৌরব। একেরপর এক গ্রন্থ রচনা করলেন জীবনবোধের কলম দিয়ে। যেগুলো জাতির জন্য তৈরী হলো বিজয়ের অমোঘ তোহফা হিসেবে। তাঁর কলম চলছে উর্ধ্ব থেকে উর্ধ্বে, আর দেশ ও জাতি শুধু বিষ্ময়ে তাকিয়ে দেখছে এক চলন্ত ইতিহাসকে।

মুসা আল হাফিজের রচনা সংখ্যা একটি বৃহদাকার ধারণ করে নিয়েছে। আলোচিত অনেক গ্রন্থের মধ্যে “মুক্তি আনন্দে আমিও হাসবো” তাঁর প্রথমদিকের রচনা। সর্বমোট বত্রিশটি কবিতা নিয়ে ২০১৯ গ্রন্থমেলায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ফুয়ারা বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে। অধম কাব্যের উপর কিছু আলোচনা করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছি মাত্র।

বইটিতে কবি তাঁর প্রথম কবিতায় বৈশ্বিক হিংস্রতার করাল গ্রাসে নিমজ্জিত মুসলিম মিল্লাতের চরম দুর্দিনে বিজয়ের উল্লাসধ্বনির আগামবার্তা শোনাচ্ছেন, বলছেন বিজয়ের মোহে বিমুগ্ধ তারুণ্যের প্রেমভূমি অধিকারের আশার বাণী। উদ্বোধন কবিতায় চাঁদকপালি চেতনার ঢেউয়ে বিপ্লবীর কুচকাওয়াজ শোনাচ্ছেন কবি এভাবে,

স্থুলতা শ্বাপদ উদরের 

অস্থি পেতে দেয়া পদতলে সীমারের 

আর নয়

শপথে সে সুর তোলে ঐ আগামীর যুবক

সে অমাবস্যালগনে কাঁটাতার হৃদয়ে আজো

পরমাণু কামড় যখন ছিনিয়ে নিলো আল-কুদস, অপর খণ্ডপ্রেম।

যন্ত্রণা সমুদ্রের সে সব ঢেউ আজ আত্মপ্রত্যয়ের কুচকাওয়াজ

প্রহেলিকা পায়ে দলে, সব সুসুপ্তি খান খান

বিবর্ণ পেছনে দেখে, সামনে বিষের মৌসুম

তবু ডাহুকের মতো এগোয়, মুছে দিতে

ইবলিসি ইন্দ্রজাল!

পথ পিচ্ছিল রক্তশিখা দাউদাউ তুর্যনাদে জ্বলে ওঠে

মৃত্যুর বন্দরে চলে প্রাণের উদ্বোধন

শপথের কলরোলে কাঁপে চুনকাম করা স্বৈরদেয়াল।

 -উদ্বোধন

বিজয়ের উল্লাস উদ্বোধন শেষেই কবি গেয়েছেন এক নিঃস্ব রমণীর নীল কণ্ঠি গান। বেদনার ডায়রী থেকে খুঁজে নিয়েছেন দেশমাতৃকার হরিনী যৌবন লুটে খাওয়ার করুণ আর্তনাদ। স্বাধিনতার ট্যাগ লাগানো মুক্তস্বরী বাজ পাখিদের কবলে থাকা অসুস্থ এক হরিনীর কথা লিখেছেন কবি,

হরিনীর গান শোন, নীল নীল গান

তার সুরে গলে যায় গিরি, আসমান

তার নাচে সুখি হয় কালের পাতাল

তার মাঝে মদ পায় প্রেমের মাতাল

মরু হয় সবুজের লাগি উন্মুখ 

মনোশিলা ঝরনায় ভেসে পায় সুখ

ঝরনার মনে লাগে জোৎস্নার ঘোর

চাঁদনির শাড়ী খোলে নেমে আসে ভোর

ধীর পায়ে হরিনীটি নদীতীরে যায়

বাঘ, সাপ, হায়েনারা পিছে তার ধায় 

নদীতে কুমির চায় হরিনীকে খাবে

উপরে ঈগল উড়ে তারে নিয়ে যাবে

এই তো হারিনী আমি মাঝখানে আছি 

তোরা চাস গান গাই, তোরা চাস নাচি

দিতে চাস স্বাধিনতা, নিতে চাস সুখে

কিন্তু অসুস্থ আমি কাদের অসুখে?

 -রমণীর ডায়রি

মুসা আল হাফিজ আপাদমস্তক একজন চিন্তার ফেরিওয়ালা, জাতির বৃত্তঘরে ঘোর লাগা চৈতন্যে বসে থাকা হুতুম প্যাঁচার ঘোঁৎ ঘোঁতানি তাঁর সহ্য হয় না, তাই গাদ্দারের কানমলে গালজুড়ে খসে এক থাপ্পড় দেন প্রতীক্ষার শব্দ মোগড়দিয়ে। সাহসের প্রবল প্রতাপ কণ্ঠে নিয়ে লুটেরা সেপাই, বুদ্ধিবৃত্তিক ইতর আর ঘাতকদের পীঠ চাপড়িয়ে হুসিয়ার করেদেন, 

সাবধান হে হানাদার! নতুন পোশাকে আসা পুরনো হায়ান! / সাবধান, আত্মবিক্রিত ধর্মবেত্তা! / তুমিও তো হালুয়া-রুটির লোভে হাওয়া বুঝে পাল খাটাও / তুমিও সত্যের শত্রু, ভাগাড়ের খবিস!

কবি এতোসব অনিয়মের মাঝেও স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন দেখান। ইতিহাস মনে করিয়ে আবারও আলোর পথের উৎসাহ দেন। সকল ভ্রান্তির অবসাদে প্রতিক্ষিত স্বাধিনতার প্রতিক্ষায় কবির সুর,

সে হত্যা করলো নবজাত শিশু, জনকের কেটে দিলো হাত

প্রতিবাদে কেঁদেছিলো মাটি ও বাতাস!

মেঘেরা আকাশ জোড়ে করেছিলো মাতম

প্রাকৃত-ব্রাহ্মলিপি হয়েছিলো দ্রোহী

ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া করেছে মিছিল

মুর্শিদী, জারি, সারি হয়েছে উত্থাল!

প্রতিবাদি বাংলার চিরায়ত নদী

যেখানে প্রত্যহের রক্তজল কথা বলে স্বাধিনতা

স্বাধিনতা কথা বলে,  শুনা যায় রাত শেষে ভোরের স্পন্দন

হায় রাত! হায় ভোর!

গাজী বুরহানুদ্দীন নিহত সন্তানের শোকে

পাশব রাত্রিকে অশ্রু দিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে!

অশ্রুর নদীতে কে বিছাবে জায়নামাজ?

কখন গৌড় গোবিন্দের প্রাচীর কাঁপিয়ে উচ্চারিত হবে আযান?

স্বাধিনতা?

 -প্রতীক্ষা

কবি মুসা আল হাফিজ একজন প্রেমিক, শ্বাশত পবিত্র বিধানের আলোর মোহনায় মত্ত ভাবুক। তিনি ইহজাগতিক মুক্তির পাশাপাশি অনন্তজীবনের মুক্তির আকাশ বিজয়ের বীণা বাজান প্রাণের বাগানে। জাতি নির্বিশেষে গোটা বিশ্বকে ডাকেন শীতল খেজুর ছায়ে। তিনি মোহাম্মাদী বাগানে আহ্বান করেন এমন সুরে, যে সুরের শরবতে তার অবিরাম জ্যোতি ঝরে / অগ্নিশিখা বুঝি সে জ্যোতির মহানন্দে হবে পাপড়ি গোলাপের। কবি তার ডাকের ফলাফল ঘোষণা করেন, এখানে তো মুক্তি হাসে প্রাণের বাগানে / জীবন শিখরে বাজে বিজয় সংগীত।

কবি একজন মাওলানা, চিরায়ত সত্যের ফেরিওয়ালা বিশ্ব মুক্তিরদূত মুহাম্মদ মুসতাফা স. এর উত্তরসূরী তথা নায়েবে রাসুল। তিনি বিশ্বাসী হৃদয়ের বাহক, বিশ্বাসে খুঁজে পান পরম প্রেম, মহান সত্ত্বার প্রেমে অবনত মস্তক পৃথিবীকে দেখে প্রেমের জায়নামাজে। তাঁর হৃদয় আরশে আজিমের অতলান্তে হাঁটে ঐকান্তিক ময়ূখী ঝলসানি স্ফুলিঙ্গ স্পর্শে। বিশ্বাসের বৃক্ষছায়া আর দয়ালের দিদারের নিঃসীম বসন্তকে ঘিরে রাখা মেঘলা গিলাফ কবি ভষ্ম করেন রুহুল কুদ্দুসের ফুঁকে। 

নবী প্রেম কবির হৃদয়ে লালিত এক মধুর স্বপ্ন। কবির হৃদয়ের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট পৃথিবীর সকল শরাব হারাম করে দিয়েছে কাউসারের লোভ। কংকালসার মানবসভ্যতার ফারানে প্রাণের বাতি জ্বলা, জোৎস্নার স্রােত বিধৌত ফুলেল মদিনা কবির স্বপ্নের শহর। কবি নবী স. এর আদর্শের ডাকে সাড়া দিয়ে জানান,

পশুর তৃষ্ণালালিত সব জাহেলিয়াত পায়ে দলে

সব ভোর, ভালোবাসা, সব হাসির মোহনা তোমার

আদর্শে-প্রেমে জগত সাজাতে

কোন গহন, সাহারা অথবা কৃষ্ণঝড়ো রাতে

কোন মহাদরিয়া পেরুতে হবে বলো?

ইয়া রাসূলাল্লাহ!

হাজির এই উম্মত, এই ক্ষুদে প্রাণ!

 -হাজির এই উম্মত

কবি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন ভ্রহ্মা-ের ইথারে, অনন্তের কোনো অনন্ত আছে কী না, দেখার পিপাসা কবিকে করে তোলে উন্মুখ, কবির চাহিদার জীবন যে এক মহা প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানি মুসাফির তা তিনি বুঝাচ্ছেন,

সৃষ্টির প্রথম ভোর থেকে 

অনন্তের শেষ বিকাল অবধি

সাঁতরাই 

তোমার চোখে চোখে!

পান করি নিযুত সাগর 

সাগরের আগের সাগর 

সাগরের পরের সাগর

সাগরের পারের সাগর

সাগরের সারের সাগর

সাগরেরা বাড়ায় আরো প্রশ্নের পিপাসা

এই তো আমি

অনন্ত জবাবের দিকে আদি অভিযান!

 -এই তো আমি

কবি মুসা আল হাফিজ মুক্তি আর বিজয়ের নেশায় নিমজ্জিত এক প্রত্যয়দ্ববীপ্ত পথিক। বিজয়ের সংগীত, মুক্তির অভিপ্রায়, কবিকে দিয়েছে বিজয়ের সন্তান খ্যাতি। কবি হাঁটেন ইতিহাসের মানচিত্র ছিড়ে, ঐতিহ্যের সড়ক মাড়িয়ে ক্লান্ত কবি পান করতে চান গৌরবের পেয়ালা। ঠিক তখনই আহত হন পেয়ালা ভর্তি গাদ্দার, লুটেরা, আর অকৃতজ্ঞদের দেখে। কবি হতাশ হন ভুলে যাওয়া ইতিহাসের বিকৃত রূপে ডুবে থাকা সজাতির নালায়েক সন্তানের বিদঘুটে হাসি দেখে। কবি এখানে তাদের হাসি নয় দেখেন তাদের কালো, অন্ধকার ভবিষ্যৎ। তবুও কবি স্বপ্ন বুনেন, স্বর্ণালী জীবনের চাষ করেন, আশার প্রতীক্ষায় কবি বলেন, মুক্তি আনন্দে আমিও হাসবো।

বালাকোট!

তুমি কেনো আমাকে ডেকেছিলো বলো?

আমি তো অমাবস্যা তীরে কাল-মহাকাল

কবে আসে স্রােতে ভেসে নুহের জাহাজ?

.....

.....

সত্তা ও সত্যের সাথে

হাতে ধাতে পাতে ভাতে

নিত্যআলোক

নয়াবিশ্বলোক!

আর আমি অভিযান থেকে বন্দি

বন্দিদের সাথে

চারপাশে অগ্নিবলয়

সময়ের সম্ভ্রম লুটছে প্রলয়।

আহা কী বিপদ!

আহা কাকে ডাকি!

এই বার ডাক শোনো

ওহে জ্যোতিঢল

এসো অবিরল

ভাসিয়ে নাও যতো পরাজিত জরা

মৃত্যুতে যুক্ত করো নতুন জীবনে

তারপর মুক্তি আনন্দে হাসবো স্বনিখিলে, প্রাণে!

  -মুক্তি আনন্দে আমিও হাসবো

কবি মুসা আল হাফিজের মুক্তির প্রতীক্ষা আমাদের হৃদয়ে জাগুক, বিজয়ের তপস্যা হোক আগামি দিনের স্বপ্ন। ইতিহাস হোক প্রতিদিনের পাঠ্যক্রম, ঐতিহ্য হোক জীবনের সূচীপত্র। গৌরব আমাদের পিছু হাঁটবেই। কবিরমত আমরাও মুক্তি আনন্দে হাসবো।

কবি মুসা আল হাফিজের কবিতার সমালোচনার জন্য অনেক কিছু বুঝার প্রয়োজন, জানার পরিধিও থাকতে হবে দিগন্ত বিস্তৃত। যার কোনোটাই আমার মধ্যে নেই। তথাপি তার কবিতায় আক্রান্ত হয়ে  সামান্য চেষ্টা করেছি। ভুলগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো। ধন্যবাদ।




No comments

Thanks a lot dear.

Theme images by nicodemos. Powered by Blogger.