মুসা আল হাফিজের 'নক্ষত্রচূর্ণ' : অন্তর্লোকের বিচ্ছুরিত ভাবদর্শন — তানিম ইশতিয়াক

 


লিখেছেন : কবি তানিম ইশতিয়াক

'আজকের পৃথিবীর রুচি গতকালের তরকারিতে খুশি হবে না‍।'
যুগচাহিদার এই প্রবণতাকে নিজের চিন্তার অগ্রসরণে একীভূত করে নিয়েছেন কবি মুসা আল হাফিজ‍। তিনি আমাদের সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক‍। দূরদর্শী ভাবনায় ও স্বতন্ত্র দর্শনে তিনি জানান দিয়েছেন নিজের উপস্থিতি‍। গভীর মনোনিবেশে প্রকৃতিপাঠ আর আত্মদর্শনের বিচ্ছুরিত কিছু উজ্জ্বল পঙক্তি নিয়ে ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় তার 'নক্ষত্রচূর্ণ' বইটি‍।
এই বইটি না কবিতার, না প্রবচনের, না প্রবন্ধের‍। বরং এতে সন্নিবেশিত হয়েছে টুকরো টুকরো কিছু দর্শন, কিছু উপলব্ধি, কিছু পর্যবেক্ষণ, কিছু প্রতিচিন্তা‍। যেন এক লহমায় ঘুরে দেখা যায় মুসা আল হাফিজের মানসজগত‍। সেই জগতটি যেই নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, সেই ভেতরের আমিত্ব থেকে ছিটকানো উজ্জ্বল কিছু রশ্মি‍মালা।
২.
বইটি পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত‍। প্রথমটাই নামপরিচ্ছেদ 'নক্ষত্রচূর্ণ‍'। এখানে প্রবচনভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়েছে ৪০টি দার্শনিক পঙক্তি‍। সেসব বাক্য নিয়ে আলোচনার চেয়ে দুয়েকটা তুলে ধরলে বরং শক্তিমত্তা ফুটে উঠবে‍।
• কথা থামাও‍। যেন লোকেরা বলে, উনি থেমে গেলেন কেন? কথা থামাও‍। যেন লোকেরা না বলে, উনি থামেন না কেন?
• যেখানে দাস আছে, সেখানেই কেউ মুনিব হয়‍।
• বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঈমানের চেয়ে তাহাজ্জুদের গুরুত্ব বেশি‍।
• শিক্ষা আছে, সংস্কৃতি নেই‍। মানে কোনোটাই নেই‍।
• রাজনীতি না থাকলে যদি খুশি হন, অধিকার না থাকলেও খুশি থাকতে হবে‍।
• শিকারীকে শিকার বানানোর নাম প্রতিরোধ‍।
৩.
বইটির দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ 'উড়ন্ত সাক্ষাৎকার'‍। এখানে আছে কিছু প্রশ্নোত্তর ও সংলাপ‍। আছে নিজের ভেতরে বুঁদ হওয়ার আকর্ষণ‍। আছে উপলব্ধি ও অনুভূতি, আত্মসিদ্ধান্তের উপলক্ষ‍। কয়েকটি তুলে ধরছি‍।
• মনে অনেক দুর্বলতা, সমাধান কোথায়?
- সমাধান তোমার মনেই‍।
• করাত বৃক্ষকে বলল, ভালোবাসি‍।
বৃক্ষ বলল, যদি ভালোবাসো, স্পর্শ কোরো না‍।
• বিজ্ঞান প্রশ্ন করল : চাঁদের গায়ে কালো দাগ কেন?
দর্শন জবাব দিল : সূর্যের কাছে আলো ভিক্ষার কলঙ্কে‍।
৪.
পরবর্তী পরিচ্ছেদের নাম 'প্রকৃতির পাঠশালা'‍। এখানে মুসা আল হাফিজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করেছেন প্রাণিজগতের বৈশিষ্ট্য‍। আর খুঁজে এনেছেন ভিন্ন দর্শন‍। পশুপাখিদের কোন কোন আচরণ মানবজীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে, কীভাবে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে; তিনি তালাশ করেছেন তারই তত্ত্ববিদ্যা‍।
মুসা আল হাফিজ লিখেছেন,
• গতি দিয়েই বীর হওয়া যায় না‍। একটি নোংরা মাছিও মিনিটে ৮ কিলোমিটার উড়তে পারে‍।
• কেবল সংখ্যাধিক্য দিয়েই ক্ষমতা লাভ হয় না‍। পৃথিবীর প্রাণীদের মধ্যে ৮০ ভাগই পোকামাকড়‍।
• শক্তি সবসময় দেখিয়ে বেড়ানোর জিনিস না‍। একমাত্র শিকারের মুহূর্ত ছাড়া বাঘ সবসময় নিজের নখরকে গুটিয়ে রাখে‍।
• আরো চাই আরো চাই ভালো না‍। খাদ্য পেটে থাকলে কিং কোবরার মতো সাপ শক্তি ও সুযোগ থাকার পরেও প্রায় একমাস পর্যন্ত শিকার করে না‍।
• শামুক হার মেনেছে ঘুমের নেশার কাছে‍। একটানা তিনবছর ঘুমাতে পারে সে‍। শামুকের জীবন আছে, কিন্তু বলার মতো তেমন কাজ নেই জীবনে‍।
• ক্ষুদ্র লক্ষ্য জীবনের অপচয় ডেকে আনে‍। পুরুষ মাছি তার ১৪ দিনের জীবন কাটিয়ে দেয় স্ত্রী মাছির মনোরঞ্জনে‍, যেখানে সে প্রায়ই ব্যর্থ হয়‍।
এই অধ্যায় পড়তে গিয়ে আমার কিছু প্রতিচিন্তা মনে এসেছে‍। প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতি এমন এক পাঠশালা, যেখানে যে যার মতো দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে নিতে পারে‍। একেকটি দর্শন আরেকটায় সাংঘর্ষিক হতে পারে‍‍। যেমন ছোটবেলায় পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছিল দুটো বিপরীতার্থক প্রবাদ‍। 'নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো', আবার 'দুষ্টু বলদের চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো‍।' এই দুটো একদিকে চিন্তা করলে যেমন বিপরীত লাগে, আবার অন্যভাবে ভাবলে সাংঘর্ষিক মনে হয় না‍। ক্ষেত্র, প্রসঙ্গ এমনকী সূক্ষ্মতার পার্থক্যে দুটো আলাদা অথচ সমান্তরাল হতে পারে‍।
যেমন গতির ব্যাপারটা‍। দুজন সমান শক্তিশালী হলে বীর সেই হবে, যার গতি বেশি‍। একটি টিভি সিরিজে ডায়লগ শুনেছিলাম, 'কে সবসময় জিতে যায়? চিতা‍। কারণ চিতা হচ্ছে দ্রুততম‍।' যদিও এখানকার বক্তব্যে গতিকে অস্বীকার করা হয়নি, বরং অন্য উপাদানের প্রতিও মনোযোগ দিতে বলা হয়েছে‍। যেভাবে সংখ্যাধিক্যের গুরুত্ব থাকলেও কেবল সেটা দিয়েই কাজ হয় না, একতা প্রয়োজন হয়‍। এখন শক্তি দেখানোর বিষয়টা নিয়ে ভাবি‍। কোথাও একবার জেনেছিলাম, 'যদি কাউকে না মেরেই কাজ হাসিল করা যায়, তাহলে মারার দরকার কী?' আবার দেখুন কিং কোবরা প্রয়োজন ছাড়া শিকার করে না, কিন্তু অন্য প্রাণীর বৈশিষ্ট্য দ্বারা সঞ্চয়ের গুরুত্বও দেখানো যায়‍। এই যে ঘুমের নেশায় শামুকের জীবন অপচয় হলো, তা আমি অন্যভাবে দেখতে পারি, এই ঘুমই হয়ত তার জীবন, নিদ্রাই তার কাজ! এছাড়া আমি এভাবেও নিতে পারি, প্রেম নিবেদন করে যাওয়াই ওই মাছির সফলতা! বেশ কয়েকবার বাঘের বৈশিষ্ট্য প্রশংসিত ও প্রাপ্তিযোগ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, আবার বলা হয়েছে, 'অন্যের জন্য ভয়ংকর হলেই টিকে থাকা যায় না, পৃথিবী থেকে ৯৭% বাঘ বিলুপ্ত হয়ে গেছে‍।'
প্রকৃতপক্ষে মুসা আল হাফিজের যে সাধনা, সেটি হচ্ছে প্রকৃতিকে গভীর উপলব্ধির মাধ্যমে অর্জনযোগ্য ও বর্জনীয় বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা‍। সত্তর রকম প্রাণিতথ্য নিয়ে চিন্তারাজ্যের যে খেলা তিনি খেলেছেন, তাতে যে তত্ত্বজ্ঞান তৈরি করেছন; আমি দারুণ মুগ্ধ হয়েছি, আর তা অনুসরণে আকর্ষিত হয়েছি‍। দৃষ্টির এই দিক আমার আরেক প্রাপ্তি‍। 'প্রকৃতির পাঠশালা' থেকে আরও কয়েকটা তুলে ধরি‍।
• যারা বিপজ্জনক, তাদের দেখার শক্তিই আলাদা‍। চোখ বন্ধ করলেও সাপ দেখতে পায়‍।
• তরুণ হরিণ চাইলো ছাগলদের নেতৃত্ব দেবে‍। মা হরিণ বলল, ছাগলের নেতা হতে হলে আগে তোমাকে ছাগল হতে হবে‍।
• শকুন যখন রাজনীতিক হয়, দেশটাকে মরা গরু বানাবার সাধনা করে‍।
• পরগাছারা এমনই‍। ওরা গাছকে আশ্রয় করে বাঁচে, কিন্তু গাছকে আড়াল করে সবার সামনে জাহির করে নিজেকেই‍।
৫.
চতুর্থ অধ্যায়ের নাম 'বোধির বৃষ্টিজল'‍। বিবিধ প্রসঙ্গ পর্যবেক্ষণে অন্যরকম প্রজ্ঞার উপস্থাপন‍। এখানে মাত্র দুটো তুলে ধরি‍।
'সে এলো‍। বলল, আমার কাছে উপহার আছে তিনটি‍। প্রেম, প্রজ্ঞা ও সুখ‍। এর মধ্যে কেবল একটিই নিতে পারো‍। লোকেরা সুখ নিয়ে ঘরে ফিরল‍ো। প্রজ্ঞা নিয়ে ঘরে ফিরলো‍। আমি প্রেম নিয়ে যেই ঘরে ফিরতে যাব, দেখলাম, সকলের ঘর যেন আমার ঘর!'
'যদি কেউ আজরাইলের আসল চেহারা দেখে, আর বাঁচবে না‍। যদি ভালোবাসার আসল চেহারা দেখে, আর মরবে না‍।'
৬.
সর্বশেষ অধ্যায় 'কথা ও কথিকা'‍। এখানে তিনি পৃথিবীর ইতিহাসের দার্শনিক ও চিন্তকদের সাথে সময় কাটিয়েছেন‍। তাদের কাছে বসে তত্ত্ব, রহস্য ও উপলব্ধির পাঠ নিয়েছেন‍। আবার কল্পনায় মুক্তজিজ্ঞাসায় তর্কও করেছেন‍। আমাদের পাঠকদের মুগ্ধতার বিষয় হচ্ছে এই যে, যখন যার প্রসঙ্গে আলাপ এনেছেন, তখন তারই চিন্তাপদ্ধতির ফ্রেমে থেকেছেন‍। সক্রেটিস-প্লেটো, চাণক্য-হিউম, খালদুন-ইকবাল এমনসব মনীষিদের সঙ্গে কথা বলছেন তাদেরই মেজাজে অথচ অধুনা প্রসঙ্গে‍। সেইসব তত্ত্ব ও যুক্তির বিশ্লেষণে তিনি তুলে এনেছেন নতুন চিন্তা‍। এভাবেই মুসা আল হাফিজ নির্মাণ করছেন স্বতন্ত্র দর্শনের দুনিয়া‍। এমনই তার চিন্তার পরিভ্রমণ‍। তেমনটাই লিখেছেন নিজের সফরনামায়—
'যখনই ভালো লাগে না, ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি‍। নিজের ভেতরে‍। সেখানে যে আবহাওয়া, মোটেও দূষিত নয়‍। সেখানে যে নদী, বড় রহস্যময়‍। সেখানে যে ধ্বনি, সে নিজেই সঙ্গীত‍। সেখানে যে নগর, বিস্ময়ে ভরা‍। সেখানে যে জনপদ, তাতে আদম (আ) থেকে এ অবধি কেউই মৃত নয়‍। সবাই বসবাস করছেন‍। আমি তাদের সাথে বসি, কথা বলি‍, বিনিময় করি প্রেম-অপ্রেম‍। তাঁবু বানাই ইতিহাসে‍। প্রিয় একজন বলেছেন, কোথাও বের হন না কেন? আমি তো নগরে নিসর্গে পর্যটন করেই চলছি দিনরাত‍। ফেরারই সময় পাচ্ছি না‍।'
...
মুসা আল হাফিজের 'নক্ষত্রচূর্ণ' : অন্তর্লোকের বিচ্ছুরিত ভাবদর্শন — তানিম ইশতিয়াক






No comments

Thanks a lot dear.

Theme images by nicodemos. Powered by Blogger.